মঙ্গলবার, ৩০শে জুন ২০২৬, দুপুর ২:৫৫

কর ব্যবস্থায় বড় সংস্কার: সমন্বয়হীন ‘ন্যূনতম কর’ ফেরতের চিন্তা করছে সরকার

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক, ঢাকা: দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘদিনের বড় একটি উদ্বেগ দূর করতে এবং কর ব্যবস্থার ন্যায্যতা বাড়াতে বড় ধরনের সংস্কারের পরিকল্পনা করছে সরকার। কোম্পানিগুলোর পরিশোধিত অতিরিক্ত ‘ন্যূনতম কর’ (মিনিমাম ট্যাক্স) যদি একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ভবিষ্যতের মুনাফার সাথে সমন্বয় করা না যায়, তবে তা সরাসরি ফেরত (রিফান্ড) দেওয়ার একটি স্থায়ী ব্যবস্থা চালু হতে যাচ্ছে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে এই যুগান্তকারী প্রস্তাবটি অন্তর্ভুক্ত হওয়ার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে।

তিন বছরে সমন্বয় না হলে মিলবে ‘অটো রিফান্ড’

প্রস্তাবিত নতুন নিয়ম অনুযায়ী, কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান যদি পরবর্তী তিন বছরের মধ্যে তাদের পরিশোধিত অতিরিক্ত ন্যূনতম কর ভবিষ্যতের করযোগ্য আয়ের সাথে সমন্বয় করতে ব্যর্থ হয়, তবে চতুর্থ বছর থেকে তারা সেই অর্থ ফেরতের দাবি জানাতে পারবে।

সবচেয়ে ইতিবাচক বিষয় হলো, এই রিফান্ড প্রক্রিয়াটি হবে সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় এবং ‘ফেসলেস’ (সরাসরি যোগাযোগহীন)। এ বিষয়ে এনবিআরের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন:

“রিফান্ড পাওয়ার জন্য কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে কর অঞ্চলের কর্মকর্তাদের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হবে না। পুরো প্রক্রিয়াটি অটোমেশনের মাধ্যমে সরাসরি কোম্পানির ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ক্রেডিট হয়ে যাবে। তবে কোনো খেলাপি বা আইন অমান্যকারী করদাতা যাতে এর অপব্যবহার করতে না পারে, সেজন্য এনবিআর ডেটা ইন্টিগ্রেশন ও কমপ্লায়েন্স ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করছে।”

বর্তমান ব্যবস্থার জটিলতা ও ব্যবসায়ীদের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ

বর্তমানে কোম্পানিগুলোর মুনাফা হোক বা লোকসান—টার্নওভার বা মোট প্রাপ্তির (গ্রস রিসিট) ওপর ভিত্তি করে ১% থেকে ৩.৫% পর্যন্ত ন্যূনতম কর দিতে হয়। এছাড়া আরও ৩০টিরও বেশি ক্যাটাগরির করদাতাদের ক্ষেত্রে এই হার সর্বোচ্চ ২০% পর্যন্ত।

ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, বিগত বছরগুলোতে সংবিধিবদ্ধ করপোরেট করের হার প্রায় ১০% কমিয়ে ২২.৫% থেকে ২৭.৫% করা হলেও, ন্যূনতম কর ফেরত পাওয়ার কোনো সুযোগ না থাকায় তাদের প্রকৃত করের বোঝা কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৫০ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে।

খাত/কোম্পানির ধরন বিদ্যমান ন্যূনতম করের হার
তামাক, কার্বোনেটেড বেভারেজ ও চিনিযুক্ত পণ্য ৩.০%
মোবাইল ফোন অপারেটর ১.৫%
সাধারণ কোম্পানি ও ৩ কোটির বেশি টার্নওভারধারী ব্যক্তি ১.০%
রপ্তানিকারক (রপ্তানি মূল্যের ওপর) ১.০%

গত বছরের বাজেটে এই অতিরিক্ত কর ‘ক্যারি ফরোয়ার্ড’ বা পরবর্তী বছরগুলোতে স্থানান্তরের সুযোগ দেওয়া হলেও, দীর্ঘমেয়াদী লোকসানে থাকা কোম্পানিগুলোর জন্য তা কোনো স্বস্তি আনতে পারেনি।

বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর কোটি কোটি টাকা আটকা

দীর্ঘদিন ধরে লোকসানে থাকা বা কম মুনাফা করা বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলো এই ব্যবস্থার কারণে মারাত্মক আর্থিক চাপে রয়েছে।

  • বাংলালিংক: ২০১৫ থেকে ২০২৪ অর্থবছর পর্যন্ত কোম্পানিটি করযোগ্য মুনাফা না থাকা সত্ত্বেও প্রায় ৯৩৮.৯০ কোটি টাকা ন্যূনতম কর দিয়েছে, যা তাদের ক্যাশ ফ্লো এবং বিনিয়োগ সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

  • রবি আজিয়াটা: গত কয়েক বছরে তাদের প্রকৃত কর দায়ের চেয়ে প্রায় ১,০০০ কোটি টাকা বেশি ন্যূনতম কর পরিশোধ করতে হয়েছে।

মোবাইল অপারেটরদের বৈশ্বিক সংগঠন ও দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো (যেমন: ফিকি ও এমসিসিআই) দীর্ঘদিন ধরে এই ‘অন্যায্য’ কর ব্যবস্থার বিরোধিতা করে আসছিল।

স্বাগত জানাচ্ছেন কর বিশেষজ্ঞ ও ব্যবসায়ীরা

সরকারের এই প্রস্তাবিত উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন অর্থনীতিবিদ ও কর বিশেষজ্ঞরা। এনবিআর-এর আয়কর নীতি বিভাগের সাবেক সদস্য সৈয়দ মো. আমিনুল করিম বলেন, “একসময় কর ফাঁকি রোধে এনবিআরের সক্ষমতার অভাবে এই ব্যবস্থা চালু করা হলেও, এটি কর ব্যবস্থার মূল দর্শনের পরিপন্থী। রিফান্ড ব্যবস্থা চালু করার সিদ্ধান্ত অত্যন্ত ইতিবাচক।”

চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্সি প্রতিষ্ঠান ‘চৌধুরী এমদাদ অ্যান্ড কোম্পানি’-র ম্যানেজিং পার্টনার এস কে জামি চৌধুরী বলেন, “এটি কর ব্যবস্থায় সমতা আনবে, তবে রিফান্ড কার্যকর করার আগে কর ফাঁকির সব পথ বন্ধ করা নিশ্চিত করতে হবে।”

অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সংস্কারটি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশের দৃশ্যপট বদলে যাবে এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।

পুরাতন সংবাদ পড়ুন
« এপ্রিল ২০২৬ »
সোমমঙ্গলবুধবৃহশুক্রশনিরবি
  
১০১১১২
১৩১৪১৫১৬১৭১৮১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭২৮২৯৩০   

অনুসরণ করুন