মঙ্গলবার, ৩০শে জুন ২০২৬, সন্ধ্যা ৭:০৩

চলে গেলেন একুশে পদকপ্রাপ্ত চিত্রশিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার

রাশেদ কবীর: রাজধানীর বাসার উঠোনে শায়িত দেশের বরেণ্য চিত্রশিল্পী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও একুশে পদকপ্রাপ্ত মুস্তাফা মনোয়ারের মরদেহ। একে একে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে আসছেন স্বজন, সহকর্মী, শিল্পী, শিক্ষার্থী ও শুভানুধ্যায়ীরা।

মানুষের উপস্থিতি ক্রমেই বাড়ছে, তবে নেই কোনো কোলাহল। চারপাশজুড়ে শুধুই শোক আর নীরবতা।

বাড়ির তিনতলার কক্ষে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করে সমবেদনা জানাচ্ছেন আগতরা। কিন্তু প্রিয় মানুষটিকে হারানোর বেদনায় অনেকেই যেন ভাষা হারিয়ে ফেলেছেন।

এই শোকের আবহে নিজেকে সামলাতে পারেননি অভিনেত্রী নিমা রহমান। প্রয়াত মুস্তাফা মনোয়ার তার ছোট মামা। তবে আত্মীয়তার বাইরেও তাদের মধ্যে ছিলো গভীর শিক্ষক-শিষ্যের সম্পর্ক।

অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘তিনি আমার ছোট মামা হন। কিন্তু বড় কথা, তিনি আমার গুরু। আমার জীবনের অনেক কিছুই তার কাছ থেকে শেখা। আজ কী বলব, কিছুই বলতে পারছি না…’

এরপর আর কোনো কথা বলতে পারেননি তিনি। চোখের জলেই প্রকাশ পেয়েছে প্রিয় মানুষকে হারানোর গভীর বেদনা।

পাশেই নীরবে বসে ছিলেন অভিনেতা তারিক আনাম খান। দীর্ঘদিনের গুরুতুল্য সহযাত্রীকে হারানোর শোক তার মুখেও স্পষ্ট। কিছুক্ষণ নীরবে বসে থেকে শেষ শ্রদ্ধা জানান তিনি।

বাসার নিচতলায় কথা হয় চিত্রশিল্পী মনিরুজ্জামানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘মুস্তাফা মনোয়ার শুধু একজন শিল্পী ছিলেন না, তিনি ছিলেন একটি প্রতিষ্ঠান। নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের পথ দেখিয়েছেন, শিল্পচর্চাকে মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। তার চলে যাওয়া দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি।’

প্রয়াত শিল্পীর শিক্ষার্থীদের কণ্ঠেও ছিল একই বেদনা। একজন বলেন, ‘স্যারের মৃত্যুর খবর এখনো বিশ্বাস করতে পারছি না। মনে হচ্ছে, তিনি আবার ক্লাসে এসে আমাদের সঙ্গে কথা বলবেন।’

আরেক শিক্ষার্থী স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘তিনি শুধু আঁকা শেখাতেন না, জীবনকে কীভাবে সুন্দরভাবে দেখতে হয়, সেটাও শেখাতেন। স্যারের প্রতিটি ক্লাস ছিল অনুপ্রেরণার জায়গা।’

বিদেশি গণমাধ্যমকর্মী আসলাম শিকদারও স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, ‘জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউটে নন্দনতত্ত্ব বিষয়ে তার ক্লাস করেছি। পরে বিভিন্ন কাজেও তার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ হয়েছে। তিনি ছিলেন অসাধারণ শিক্ষক, অসাধারণ মানুষ। শিল্প, সংস্কৃতি ও মানবিকতার যে শিক্ষা তিনি দিয়েছেন, তা আজীবন আমাদের সঙ্গে থাকবে।’

আরেক শিক্ষার্থী বলেন, ‘স্যারের দরজা সব সময় সবার জন্য খোলা থাকত। কোনো প্রশ্ন নিয়ে গেলে কখনো ফিরিয়ে দেননি। তিনি বিশ্বাস করতেন, জ্ঞান ভাগ করে নিলেই তার প্রকৃত মূল্য তৈরি হয়।’

একজন প্রবীণ সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের ভাষায়, ‘মুস্তাফা মনোয়ারের জীবন ছিল শিল্পের জন্য নিবেদিত। তিনি শুধু ছবি আঁকেননি, একটি প্রজন্মকে শিল্পবোধে গড়ে তুলেছেন। তাঁর অনুপস্থিতি দীর্ঘদিন অনুভূত হবে।’

দিন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে মানুষের ভিড়। ফুল হাতে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে আসছেন শিল্পী, সাহিত্যিক, সাংস্কৃতিক কর্মী, শিক্ষার্থী ও শুভানুধ্যায়ীরা। সবার কণ্ঠে একটাই অনুভূতি- মুস্তাফা মনোয়ার চলে গেছেন, কিন্তু তার শিল্প, শিক্ষা ও মানবিকতার উত্তরাধিকার বেঁচে থাকবে আগামী প্রজন্মের হৃদয়ে।

পুরাতন সংবাদ পড়ুন
« ডিসেম্বর ২০২৬ »
সোমমঙ্গলবুধবৃহশুক্রশনিরবি
 
১০১১১২১৩
১৪১৫১৬১৭১৮১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
২৮২৯৩০৩১   

অনুসরণ করুন