বুধবার, ৭ই অক্টোবর ২০২৬, বিকাল ৩:০৬

মেসি এক আবেগের নাম

পাড়া-মহল্লায় যখন দেখি ছোট্ট কোনো শিশু সাদা-নীল জার্সি পরে ঘুরে বেড়াচ্ছে, পিঠে ১০ নম্বর লেখা, আর গর্ব করে বলছে, ‘আমি মেসি’। তখন বুঝতে পারি, লিওনেল মেসি শুধু একজন ফুটবলারের নাম নন, তিনি একটি প্রজন্মের আবেগ, ভালোবাসা ও শৈশবের স্মৃতির নাম।

আমরা যে ফুটবল মহাতারকার খেলা দেখে বড় হয়েছি, যার বাঁ পায়ের জাদুতে মুগ্ধ হয়েছি, গোলের পর যার উদযাপনে আনন্দে মেতেছি, আবার পরাজয়ের পর যার চোখের পানি দেখে নিজের অজান্তেই কেঁদেছি, তিনি আর্জেন্টিনার লিওনেল মেসি। জাতীয় দলের জার্সিতে তার বিদায়ের মুহূর্ত মনে করিয়ে দিচ্ছে তাকে নিয়ে স্মৃতি ঘেরা বহু কথা। একটি যুগের অবসান ঘটতে যাচ্ছে। তবে ফুটবল আর মেসি আমাদের কাছে সমার্থক হয়েই থাকবে।

বুয়েনস এইরেসের সময় মঙ্গলবার রাত ৮টা (বাংলাদেশ সময় বুধবার ভোর ৫টা), মনুমেন্টাল স্টেডিয়ামে নীল-সাদা জার্সিতে শেষবারের মতো মাঠে নামলেন লিওনেল মেসি। প্রতিপক্ষ ছিল বেনিন। মাঠে নামার সেই মুহূর্তটিও তাই ছিল অন্য রকম আবেগের। যে জার্সি পরে তিনি বছরের পর বছর কোটি কোটি মানুষকে আনন্দ দিয়েছেন, যে জার্সির জন্য অসংখ্য রাত জেগেছে একটি প্রজন্ম, সেই জার্সিতে শেষবারের মতো তাকে দেখতে পাওয়া, এ যেন শুধু একটি ম্যাচ নয়, একটি অধ্যায়ের শেষ পৃষ্ঠা।

বিদায়ী ম্যাচের পর মেসির কথাতেও ছিল আবেগ আর কৃতজ্ঞতা। তিনি বলেন, ‘একজন আর্জেন্টাইন হতে পেরে আমি ঈশ্বরের কাছে চিরকৃতজ্ঞ। আমি আর্জেন্টাইন হিসেবে গর্বিত এবং আপনাদের সবাইকে সঙ্গে নিয়ে আমার স্বপ্নগুলো পূরণ করতে পেরে আমি গর্বিত। আপনাদের সবাইকে অসংখ্য ধন্যবাদ, আমি আপনাদের সবাইকে ভালোবাসি।’ এই কথাগুলো শুধু একজন ফুটবলারের বিদায়ী বক্তব্য নয়, যেন একটি দীর্ঘ যাত্রার শেষে কোটি ভক্তের জন্য বলা ভালোবাসার শেষবার্তা।

মেসিকে বেশি চিনেছি জাতীয় দলের জার্সিতে

লিওনেল মেসি ছোটবেলা থেকেই ক্লাব ফুটবলে নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। ইউরোপের বড় বড় মঞ্চে একের পর এক রেকর্ড গড়েছেন, অসংখ্য শিরোপা জিতেছেন, ব্যক্তিগত পুরস্কারে ভরিয়েছেন নিজের ঝুলি। ক্লাব ফুটবলে তার অর্জনের তালিকা এত দীর্ঘ যে, সেগুলো আলাদা করে বলা মুশকিল।

কিন্তু গোটা বিশ্বের মানুষ, বিশেষ করে ফুটবলপ্রেমীরা, মেসিকে সবচেয়ে বেশি মনে রাখবেন সাদা-নীল জার্সিতে। দেশের হয়ে বিশ্বকাপের মাঠে যখন তিনি নেমেছেন, তখন তার খেলা শুধু ১১ জন খেলোয়াড়ের লড়াই ছিল না, হয়ে উঠেছিল কোটি মানুষের আবেগের কেন্দ্রবিন্দু।

আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির পথচলা সব সময় সহজ ছিল না। ব্যর্থতা এসেছে, সমালোচনা এসেছে, এসেছে ট্রফি না জেতার হতাশা। কোপা আমেরিকার ফাইনালে হার, বিশ্বকাপের ফাইনালে পরাজয়, এসব মুহূর্তে মেসির চোখের পানি দেখেছে পুরো বিশ্ব। একসময় জাতীয় দলের হয়ে কিছুই জিততে না পারার জন্য তাকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়েছিল। কিন্তু মেসি থামেননি। বারবার ফিরে এসেছেন। আরও শক্তভাবে ফিরে এসেছেন। আর শেষ পর্যন্ত সেই আর্জেন্টিনার জার্সিতেই তিনি ছুঁয়েছেন এমন সব সাফল্য, যা তাকে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়ের আসনে বসিয়েছে।

২০২১ সালের কোপা আমেরিকা জয় যেন ছিল বহু বছরের অপেক্ষার অবসান। এরপর ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপ। সেই বিশ্বকাপে মেসির নেতৃত্বে আর্জেন্টিনার শিরোপা জয় ছিল তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে আবেগঘন অধ্যায়গুলোর একটি। যে বিশ্বকাপের ট্রফি তার ক্যারিয়ারে এতদিন অধরা ছিল, সেটিই শেষ পর্যন্ত উঠেছিল তার হাতে। সেদিন শুধু আর্জেন্টিনা নয়, পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে মেসিভক্তরা আনন্দে কেঁদেছিলেন। মনে হয়েছিল, মেসির স্বপ্ন পূরণ মানেই যেন নিজেদের স্বপ্ন পূরণ।

একজন তারকা, অথচ এতটা আপন

ফুটবলে নিজের জায়গা তিনি তৈরি করেছেন সর্বোচ্চ উচ্চতায়। কিন্তু এত বড় তারকা হয়েও মেসির মধ্যে অহংকারের ছাপ খুব একটা দেখা যায়নি। বরং তার চোখে-মুখে সব সময় ছিল এক ধরনের স্বাভাবিকতা, বিনয় আর শান্তভাব। একজন বিশ্বসেরা খেলোয়াড় হয়েও তিনি নিজেকে অন্যদের চেয়ে আলাদা করে দেখানোর চেষ্টা করেননি। মাঠে প্রতিপক্ষকে সম্মান করেছেন, সতীর্থদের সঙ্গে সাফল্য ভাগ করে নিয়েছেন, ব্যর্থতার দায়ও অনেক সময় নিজের কাঁধে নিয়েছেন।

পরিবারের প্রতি তার ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতাও মুগ্ধ করেছে মানুষকে। স্ত্রী আন্তোনেলা রোকুজ্জো, সন্তান ও পরিবারের সদস্যদের প্রতি মেসির টান তার ব্যক্তিগত জীবনের এক অন্য ছবি সামনে আনে। ফুটবল মাঠের মহাতারকা মেসির আড়ালে তখন দেখা যায় একজন সাধারণ মানুষকে, যিনি পরিবারকে ভালোবাসেন, কাছের মানুষদের গুরুত্ব দেন এবং নিজের সাফল্যের পেছনে তাদের অবদান স্বীকার করেন। হয়তো এ কারণেই মেসি শুধু একজন ফুটবলার হয়ে থাকেননি। তিনি হয়ে উঠেছেন ঘরের মানুষ।

মেসির কান্নায় কেঁদেছে একটি প্রজন্ম

ফুটবলে জয়-পরাজয় থাকবেই। গোল করার পর সতীর্থদের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেওয়া মেসিকে যেমন দেখেছি, তেমনি মাঠে হেরে গিয়ে চরম হতাশায় ভেঙে পড়তেও দেখেছি। কখনো ট্রফি হাতে তার হাসি আমাদের আনন্দ দিয়েছে। আবার কোনো গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে হারের পর তার চোখের পানি টেলিভিশনের পর্দায় দেখে কেঁদেছেন তার অগণিত ভক্ত। সেই মুহূর্তগুলোতে আর্জেন্টিনা আর মেসি যেন আলাদা কোনো শব্দ ছিল না। মনে হয়েছে, মেসি শুধু আর্জেন্টিনার খেলোয়াড় নন, তিনি আমাদেরও কেউ। আমাদের আনন্দের অংশ, আমাদের কষ্টের অংশ।

যে মানুষটির সঙ্গে আমাদের ব্যক্তিগত কোনো পরিচয় নেই, যার সঙ্গে কখনো কথা হয়নি, যার জীবন আমাদের থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে, তবু তার একটি গোল আমাদের আনন্দিত করেছে, তার একটি হার আমাদের মন খারাপ করেছে। এটাই তো আবেগের শক্তি। এটাই মেসি।

বাংলাদেশের পাড়া-মহল্লায় আর্জেন্টিনার পতাকা উড়েছে, দেয়ালে আঁকা হয়েছে মেসির ছবি, ছোট্ট শিশুরা মেসির মতো চুলের কাট নিয়েছে, ১০ নম্বর জার্সি পরে মাঠে নেমেছে। কেউ হয়তো ঠিকভাবে তার নামও উচ্চারণ করতে শেখেনি, কিন্তু জানে, ১০ নম্বর মানেই মেসি।

একটি প্রজন্মের শৈশবের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা নাম মেসি

আমাদের প্রজন্মের অনেকের শৈশব, কৈশোর ও তারুণ্যের সঙ্গে মেসির নাম জড়িয়ে আছে। ২০০৬ বিশ্বকাপে তার উত্থান দেখেছি। ২০১০, ২০১৪, ২০১৮-প্রতিটি বিশ্বকাপের সঙ্গে মিশে আছে তার কোনো না কোনো স্মৃতি। ২০১৪ সালে বিশ্বকাপের ফাইনালে হারের কষ্ট, ২০১৬ সালে জাতীয় দল ছাড়ার ঘোষণা, পরে ফিরে আসা-সবই যেন আমাদের নিজেদের জীবনের কোনো না কোনো অধ্যায়ের সঙ্গে মিশে গেছে।

মাহেন্দ্রক্ষণ ২০২২

কাতারের মাঠে মেসি যখন বিশ্বকাপের ট্রফি হাতে তুললেন, তখন মনে হয়েছিল দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান হলো। একজন ফুটবলারের ব্যক্তিগত স্বপ্ন পূরণের সঙ্গে পৃথিবীর কোটি মানুষের আবেগ কীভাবে একাকার হয়ে যেতে পারে, সেই দৃশ্য দেখেছিলাম সেদিন। সেদিন মেসি একা বিশ্বকাপ জেতেননি, তার সঙ্গে যেন জিতেছিল তার অপেক্ষায় থাকা কোটি কোটি মানুষ।

পুরস্কারের চেয়ে বড় অর্জন মানুষের ভালোবাসা

ক্যারিয়ারে অসংখ্য পুরস্কার যার ঝুলিতে, সেই মেসি শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় যে পুরস্কারটি অর্জন করেছেন, সেটি কোনো ট্রফি নয়। সেটি মানুষের ভালোবাসা।ব্যক্তিগত পুরস্কার, গোল, রেকর্ড, শিরোপা-সময় গেলে এগুলোর অনেক কিছুই হয়তো নতুন প্রজন্মের খেলোয়াড়েরা ভেঙে ফেলবেন। মেসির কোনো রেকর্ড হয়তো একদিন আর থাকবে না। তার গোলসংখ্যা ছাড়িয়ে যাবেন কেউ। তার কোনো শিরোপার সংখ্যাকেও পেছনে ফেলতে পারেন অন্য কোনো ফুটবলার। কিন্তু মানুষের ভালোবাসার জায়গাটি কি এত সহজে কেউ দখল করতে পারবেন? সম্ভবত না। কারণ মেসির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক শুধু পরিসংখ্যানের নয়। তার সঙ্গে সম্পর্ক আবেগের। তার সঙ্গে সম্পর্ক স্মৃতির। তার সঙ্গে সম্পর্ক একটি প্রজন্মের বেড়ে ওঠার।

মেসির পরেও থাকবে মেসি

মেসির ফুটবল যুগের অবসান হয়তো একদিন আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা হবে। তারপর আর মাঠে দেখা যাবে না সেই ১০ নম্বর জার্সির জাদু। আর দেখা যাবে না ডিফেন্ডারদের ভিড়ের মধ্যে দিয়ে ছোট ছোট পায়ে এগিয়ে যাওয়া সেই মানুষটিকে। গোলরক্ষকের সামনে দাঁড়িয়ে মুহূর্তের মধ্যে সিদ্ধান্ত নেওয়া সেই বাঁ পা হয়তো আর নতুন কোনো গল্প লিখবে না। কিন্তু মেসি কি সত্যিই শেষ হয়ে যাবেন? না। ফুটবলের ইতিহাসে অনেক কিংবদন্তি এসেছেন, আরও আসবেন। নতুন নতুন তারকা আলো ছড়াবেন। নতুন প্রজন্ম নতুন নায়ক খুঁজে নেবে। কিন্তু প্রত্যেক প্রজন্মেরই কিছু মানুষ থাকে, যাদের সঙ্গে তাদের সময়টা চিরদিনের জন্য জড়িয়ে যায়। আমাদের প্রজন্মের কাছে তেমনই একজন লিওনেল মেসি।

তিনি আমাদের শিখিয়েছেন, প্রতিভা যত বড়ই হোক, বিনয় তার সৌন্দর্য বাড়ায়। ব্যর্থতা যত কঠিনই হোক, ফিরে আসার চেষ্টা থামানো যায় না। স্বপ্ন যত দীর্ঘ সময়ই অধরা থাকুক, তার পেছনে ছুটতে হয়। মেসি ফুটবলের জন্য তার সময়ে যা করে গেলেন, ভবিষ্যতে যুগের পর যুগ কেউ তা করতে পারবেন কি না, সেটি সময়ই বলে দেবে। হয়তো কেউ তার রেকর্ড ভাঙবেন, কেউ তার চেয়েও বেশি গোল করবেন, কেউ আরও বেশি শিরোপা জিতবেন। কিন্তু মেসি যে আবেগ তৈরি করে গেছেন, সেটি কি কেউ ভাঙতে পারবেন?

সময়ের সঙ্গে ফুটবল বদলাবে। বদলাবে তারকা, বদলাবে কৌশল, বদলাবে মাঠের গল্প। কিন্তু একটি প্রজন্মের হৃদয়ে নীল-সাদা জার্সির ১০ নম্বর হয়ে লিওনেল মেসি থেকে যাবেন একই রকম। কারণ মেসি শুধু একজন ফুটবলার নন। মেসি এক আবেগের নাম।

পুরাতন সংবাদ পড়ুন
« সেপ্টেম্বর ২০২৬ »
সোমমঙ্গলবুধবৃহশুক্রশনিরবি
 ১২৩৪৫৬
৭৮৯১০১১১২১৩
১৪১৫১৬১৭১৮১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
২৮২৯৩০    

অনুসরণ করুন