আগামী বছরের মধ্যে ১০টি উড়োজাহাজ লিজ (ভাড়া) নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে সরকারি বিমানসংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। নতুন কেনা ১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজ ২০৩১ সাল থেকে বিমান বহরে যুক্ত হবে। তবে তার আগ পর্যন্ত সক্ষমতার ঘাটতি পূরণে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
রোববার (১৯ জুলাই) বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত গণমাধ্যমকে এ তথ্য জানান।
তিনি বলেন, ‘আমরা এ বছরের মধ্যে ১০টি উড়োজাহাজ লিজ নেওয়ার পরিকল্পনা করছি। এর ফলে আমরা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক রুটে ফ্লাইটের সংখ্যা বাড়াতে পারব। পাশাপাশি নতুন গন্তব্যে সেবা সম্প্রসারণ করাও সম্ভব হবে।’
প্রতিমন্ত্রী জানান, রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী এই সংস্থা প্রাথমিকভাবে তিনটি উড়োজাহাজ লিজ নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে। তবে কার্যক্রমের প্রয়োজনীয়তা এবং রুট সম্প্রসারণের কৌশলের ওপর ভিত্তি করে এই সংখ্যা বাড়তে পারে।
এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বিমানের বর্তমান ১৯টি উড়োজাহাজের বহর ২০২৭ সালের মধ্যে বেড়ে ২৯টিতে দাঁড়াতে পারে, যা ৫২ দশমিক ৬ শতাংশ বৃদ্ধি এবং সংস্থাটির স্বল্পমেয়াদে সবচেয়ে বড় সক্ষমতা সম্প্রসারণগুলোর একটি।
মিল্লাত জানিয়েছেন, উড়োজাহাজ লিজ নেওয়ার পুরো প্রক্রিয়ায় সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সরকার বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। এ লক্ষ্যে পুরো কার্যক্রম তদারকির জন্য একজন আন্তর্জাতিক পরামর্শক নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, সরকার চায় লিজ প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্যভাবে সম্পন্ন হোক। এজন্য আন্তর্জাতিক পরামর্শক নিয়োগের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে প্রায় ৪০টি আবেদন জমা পড়েছে। এসব আবেদন থেকে যোগ্য একটি প্রতিষ্ঠান নির্বাচন করা হবে, যারা পুরো লিজ কার্যক্রম তদারকির দায়িত্ব পালন করবে।
তিনি আরও জানান, ১০টি উড়োজাহাজ লিজ নেওয়ার এই উদ্যোগ বিমানের ১৪টি নতুন বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার পরিকল্পনার সঙ্গে সম্পূর্ণ আলাদা। বোয়িংয়ের সঙ্গে পরিকল্পিত ক্রয়চুক্তির সম্ভাব্য মূল্য প্রায় ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ওই নতুন উড়োজাহাজগুলো ২০৩১ থেকে ২০৩৫ সালের মধ্যে ধাপে ধাপে সরবরাহ করা হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
মিল্লাত বলেন, বোয়িং ও এয়ারবাসের মতো নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে নতুন উড়োজাহাজ তাৎক্ষণিকভাবে সংগ্রহ করা সম্ভব নয়। এ কারণে ক্রমবর্ধমান যাত্রী চাহিদা মোকাবিলায় অন্তর্বর্তীকালীন সমাধান হিসেবে আন্তর্জাতিক লিজ বাজার থেকে উড়োজাহাজ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে বিদ্যমান রুটে ফ্লাইট সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ গন্তব্য চালুর সুযোগ তৈরি হবে।
এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ইতোমধ্যে ছয় বছরের জন্য তিনটি বোয়িং ৭৮৭-৯ ড্রিমলাইনার ড্রাই লিজে নেওয়ার উদ্দেশ্যে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করেছে। লক্ষ্য হচ্ছে, ২০২৭ সালের শুরুতেই এসব উড়োজাহাজ বহরে যুক্ত করা।
গত ১৫ জুলাই প্রকাশিত ‘রিকোয়েস্ট ফর প্রপোজাল’ (আরএফপি) অনুযায়ী, ৭২ মাসের ড্রাই লিজে তিনটি বোয়িং ৭৮৭-৯ উড়োজাহাজের জন্য উড়োজাহাজের মালিক, নির্মাতা প্রতিষ্ঠান, এয়ারলাইনস, অপারেটর এবং লিজ প্রদানকারী কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে প্রস্তাব চাওয়া হয়েছে।
ড্রাই লিজ ব্যবস্থার আওতায় বিমান কেবল উড়োজাহাজ গ্রহণ করবে। অর্থাৎ এর সঙ্গে কোনো চালক (ক্রু), রক্ষণাবেক্ষণ সেবা কিংবা বিমা অন্তর্ভুক্ত থাকবে না। নিজস্ব এয়ার অপারেটর সার্টিফিকেটের আওতায় বিমানের নিজস্ব পাইলট ও জনবল দিয়েই উড়োজাহাজগুলো পরিচালনা করা হবে।
প্রস্তাব জমা দেওয়ার শেষ সময় নির্ধারণ করা হয়েছে আগামী ৯ আগস্ট। বিমান ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারিকে উড়োজাহাজ সরবরাহের পছন্দের তারিখ হিসেবে উল্লেখ করেছে। তবে ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে সরবরাহ করা হলে সেসব প্রস্তাবও বিবেচনায় নেওয়া হবে।
বিমান কর্তৃপক্ষের প্রত্যাশা, লিজ নেওয়া প্রতিটি উড়োজাহাজ বছরে প্রায় ৪ হাজার ঘণ্টা ফ্লাইট পরিচালনা করতে সক্ষম হবে। এ জন্য শর্ত দেওয়া হয়েছে, ২০২৭ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত উড়োজাহাজগুলোর বয়স ১৫ বছরের বেশি হওয়া যাবে না। এছাড়া সেগুলোকে জিইএনএক্স-১বি৭৪/৭৫ ইঞ্জিনচালিত হতে হবে এবং দুই শ্রেণির কেবিন বিন্যাসে ৩০০টির বেশি যাত্রী ধারণক্ষমতা থাকতে হবে।
বর্তমানে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বহরে মোট ১৯টি উড়োজাহাজ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে চারটি বোয়িং ৭৭৭-৩০০ইআর, চারটি বোয়িং ৭৮৭-৮ ড্রিমলাইনার, দুটি বোয়িং ৭৮৭-৯ ড্রিমলাইনার, চারটি বোয়িং ৭৩৭ এবং পাঁচটি ড্যাশ ৮-৪০০ টার্বোপ্রপ উড়োজাহাজ।
নতুন বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার পরিকল্পনার পাশাপাশি সরকার দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের অংশ হিসেবে এয়ারবাসের উড়োজাহাজ সংগ্রহের সম্ভাবনাও পর্যালোচনা করছে। এর লক্ষ্য ভবিষ্যতের জন্য একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও টেকসই মিশ্র বিমানবহর গড়ে তোলা।
সংশ্লিষ্টদের মতে, লিজের মাধ্যমে ১০টি উড়োজাহাজ বহরে যুক্ত হলে বিমানের বর্তমান পরিচালন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। এর ফলে নতুন প্রজন্মের উড়োজাহাজ হাতে পাওয়ার আগ পর্যন্ত বিদ্যমান রুটে সেবা আরও জোরদার করা এবং নতুন গন্তব্যে ফ্লাইট পরিচালনার সুযোগ সৃষ্টি হবে।
সূত্র: বাসস


















