মঙ্গলবার, ১৩ই অক্টোবর ২০২৬, রাত ১:০৫

সরকারি ভাতার আওতায় ৬২ লাখ প্রবীণ: সমাজকল্যাণ সচিব

দেশের প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সামাজিক ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বর্তমানে ৬২ লাখ নারী-পুরুষকে বয়স্ক ভাতা দিচ্ছে সরকার। একই সঙ্গে চলতি বছর ভাতার পরিমাণও কিছুটা বাড়ানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মোহাম্মদ আবু ইউছুফ।
তবে বাজেট সীমাবদ্ধতার কারণে এখনো বয়স্ক ভাতা পাওয়ার যোগ্য অনেক প্রবীণ এ কর্মসূচির আওতার বাইরে রয়েছেন বলে জানিয়েছেন তিনি। ভবিষ্যতে বাজেট বরাদ্দ বাড়ানো গেলে যোগ্য সব প্রবীণকে পর্যায়ক্রমে এ কর্মসূচির আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
বুধবার (৭ অক্টোবর) নিজ দপ্তরে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)-কে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব জানিয়েছেন, প্রতি বছর ধাপে ধাপে বয়স্ক ভাতা কর্মসূচির পরিধি বাড়ানো হচ্ছে। একসময় ৬০ লাখ প্রবীণ এই ভাতা পেতেন। পরে উপকারভোগীর সংখ্যা বাড়িয়ে ৬১ লাখ করা হয়। চলতি বছর আরও ১ লাখ প্রবীণকে কর্মসূচির আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়ায় বর্তমানে মোট ৬২ লাখ প্রবীণ বয়স্ক ভাতার সুবিধা পাচ্ছেন।
তিনি বলেন, এখনো দেশের সব প্রবীণকে এই কর্মসূচির আওতায় আনা সম্ভব হয়নি। নারীদের ক্ষেত্রে ৬০ বছর এবং পুরুষদের ক্ষেত্রে ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী ব্যক্তিরা বয়স্ক ভাতা পাওয়ার যোগ্য। তবে নির্ধারিত বয়সে পৌঁছালেই কেউ স্বয়ংক্রিয়ভাবে এ সুবিধা পান না। এ ক্ষেত্রে নির্ধারিত নীতিমালা ও যোগ্যতার শর্ত পূরণ করতে হয়। আবেদনকারীদের যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে উপকারভোগী নির্বাচন করা হয়।
সচিব বলেন, যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও বাজেটের সীমাবদ্ধতার কারণে কিছু মানুষকে তাৎক্ষণিকভাবে কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হয় না। বর্তমানে বয়স্ক ভাতার জন্য বেশ কিছু আবেদন রয়েছে, যেগুলো বাজেটের সীমাবদ্ধতার কারণে শতভাগ বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না। তবে বিষয়টি সরকার গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। ভবিষ্যতে বাজেটের সক্ষমতা বাড়লে ধাপে ধাপে সব যোগ্য ব্যক্তিকে বয়স্ক ভাতার আওতায় আনার চেষ্টা করা হবে।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব বলেন, দেশের প্রবীণ জনগোষ্ঠী গুরুত্বপূর্ণ মানবসম্পদ। দীর্ঘ কর্মজীবনে অর্জিত তাদের অভিজ্ঞতা, জ্ঞান ও দক্ষতা সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য মূল্যবান। কর্মজীবন থেকে অবসর নেওয়ার অর্থ একজন মানুষের সামাজিক প্রয়োজনীয়তা শেষ হয়ে যাওয়া নয়। বরং প্রবীণদের অভিজ্ঞতা ও প্রজ্ঞাকে কাজে লাগানোর পাশাপাশি তাদের সামাজিক মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, প্রবীণদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বয়স্ক ভাতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বিশেষ করে দরিদ্র ও অসহায় প্রবীণদের দৈনন্দিন জীবনযাপনের ব্যয় মেটাতে এই ভাতা কিছুটা সহায়তা করছে। পাশাপাশি পরিবারের ওপর তাদের নির্ভরশীলতা কমানো এবং আত্মমর্যাদা ধরে রাখার ক্ষেত্রেও এ ধরনের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি ভূমিকা রাখছে।
সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় প্রবীণদের আরও বেশি সুবিধা দেওয়ার জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি। তার মতে, দেশের জনসংখ্যার একটি বড় অংশ এখন প্রবীণ। মানুষের গড় আয়ু বাড়ার সঙ্গে ভবিষ্যতে এই জনগোষ্ঠীর সংখ্যাও আরও বৃদ্ধি পাবে। তাই প্রবীণদের সামাজিক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপদ চলাচল এবং সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়ানোর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
প্রবীণদের চলাচলের সুবিধার বিষয়ে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মোহাম্মদ আবু ইউছুফ বলেন, দেশের রেল ও মেট্রোরেলসহ কিছু গণপরিবহন ব্যবস্থায় প্রবীণদের জন্য বিশেষ সুবিধা রয়েছে। গণপরিবহনে তাদের জন্য বিশেষ ভাড়ার ব্যবস্থাও চালু আছে। রেল ও মেট্রোরেলসহ পাবলিক ট্রান্সপোর্টে প্রবীণ নাগরিকদের ২৫ শতাংশ বিশেষ সুবিধা দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে বলে জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, প্রবীণদের জন্য শুধু আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করাই যথেষ্ট নয়। তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে স্বাস্থ্যসেবা, যাতায়াত, নিরাপদ আবাসন, বিনোদন এবং সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের সুযোগও নিশ্চিত করা প্রয়োজন। প্রবীণবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলা গেলে তারা পরিবার ও সমাজে আরও সক্রিয়ভাবে ভূমিকা রাখতে পারবেন।
সচিব বলেন, প্রবীণদের কল্যাণে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি পরিবার ও সমাজেরও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে। বাংলাদেশের সামাজিক ও পারিবারিক কাঠামোতে প্রবীণদের সম্মান করা এবং তাদের দেখাশোনার দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। এই মূল্যবোধ ধরে রাখার পাশাপাশি আধুনিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রবীণদের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে।
তিনি বলেন, অনেক প্রবীণ এখনো শারীরিকভাবে সক্ষম এবং বিভিন্নভাবে সমাজে অবদান রাখার সামর্থ্য রাখেন। তাদের অভিজ্ঞতা ও কর্মদক্ষতা কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি করা গেলে একদিকে প্রবীণদের সক্রিয় জীবন নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে নবীন প্রজন্মও তাদের অভিজ্ঞতা থেকে উপকৃত হবে।
বয়স্ক ভাতা কর্মসূচি ভবিষ্যতে আরও সম্প্রসারণের বিষয়ে তিনি বলেন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিকে আরও কার্যকর, স্বচ্ছ ও লক্ষ্যভিত্তিক করাই সরকারের লক্ষ্য। প্রকৃত সুবিধাভোগীদের শনাক্ত করে তাদের কাছে সরকারি সহায়তা পৌঁছে দিতে তথ্যভিত্তিক ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে প্রকৃত দরিদ্র ও অসহায় মানুষ যেমন উপকৃত হবেন, তেমনি সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহারও নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
তিনি বলেন, বয়স্ক ভাতার আওতা বৃদ্ধির পাশাপাশি উপকারভোগীদের ভাতার পরিমাণও পর্যায়ক্রমে বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। চলতি বছর উপকারভোগীর সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি ভাতার পরিমাণও কিছুটা বৃদ্ধি করা হয়েছে। এর ফলে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ আগের তুলনায় বেশি আর্থিক সহায়তা পাচ্ছেন।
ড. মোহাম্মদ আবু ইউছুফ বলেন, দেশের আর্থ-সামাজিক বাস্তবতা বিবেচনায় প্রবীণদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির পরিধি আরো বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে। এজন্য পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। সরকারের সক্ষমতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বয়স্ক ভাতার আওতাও আরো সম্প্রসারিত হবে।
তিনি বলেন, ‘আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। বাজেট বৃদ্ধি পেলে বয়স্ক ভাতা পাওয়ার যোগ্য সকল ব্যক্তিকে পর্যায়ক্রমে এ ভাতার আওতায় নিয়ে আসা হবে।’
সরকারের এ উদ্যোগের ফলে দেশের বিপুলসংখ্যক প্রবীণ মানুষ আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি সামাজিক নিরাপত্তার একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন বলে জানান তিনি। তিনি বলেন, তবে ক্রমবর্ধমান প্রবীণ জনগোষ্ঠীর কথা বিবেচনা করে ভবিষ্যতে শুধু ভাতা প্রদান নয়, স্বাস্থ্যসেবা, গণপরিবহনে বিশেষ সুবিধা, সামাজিক অংশগ্রহণ এবং তাদের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগানোর সুযোগসহ সমন্বিত প্রবীণবান্ধব নীতি বাস্তবায়ন করা হবে সম্ভব হবে।
পুরাতন সংবাদ পড়ুন
« আগস্ট ২০৩৪ »
সোমমঙ্গলবুধবৃহশুক্রশনিরবি
 ১২৩৪৫৬
৭৮৯১০১১১২১৩
১৪১৫১৬১৭১৮১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
২৮২৯৩০৩১   

অনুসরণ করুন