মোংলা থেকে দেশের উত্তরাঞ্চল পর্যন্ত করিডোরভিত্তিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে টিকিয়ে রাখতে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতে সরকার কাজ শুরু করেছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এর অংশ হিসেবে বন্দর, ইকোনমিক জোন, ইপিজেড আর শিল্প কলকারকানায় গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে বলে আশ্বস্ত করেছেন তিনি।বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) মোংলা বন্দরের উন্নয়ন ও আধুনিকায়নে ৪ হাজার ৬৮ কোটি টাকার মেগা প্রজেক্টের ভিক্তিপ্রস্তুর স্থাপন জেটি নির্মাণ কাজের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
সকাল ১০টায় হেলিকপ্টারযোগে মোংলা বন্দর এলাকায় পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী। পরে বন্দরের ৯ নম্বর জেটিতে আয়োজিত সুধী সমাবেশ ও উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অংশ নেন তিনি। আয়োজন ঘিরে পুরো উপকূলীয় অঞ্চলে এক অভূতপূর্ব উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়।নেতাকর্মীরা প্রধানমন্ত্রীকে এক নজর দেখার জন্য সেই সকাল থেকে মোংলা-খুলনা মহাসড়কে ভিড় করে ছিলেন। সড়কের দুই পাশে সারিবদ্ধভাবে প্রমানমন্ত্রীকে স্বাগত জানান মোংলা-রামপালের বিএনপির লাখো নারী-পুরুষ নেতাকর্মীরা।বন্দর উন্নয়নে ৪০৬৮ কোটি টাকার মেগা প্রজেক্ট বন্দরের আধুনিকায়নে বিশাল কর্মযজ্ঞের অংশ হিসেবে বৃহস্পতিবারের অনুষ্ঠানে একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর হয়। ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ’ কর্তৃপক্ষ এবং বৈশ্বিক অবকাঠামো জায়ান্ট চায়না রেলওয়ে কনস্ট্রাকশন করপোরেশনের (সিআরসিসি) চেয়ারম্যানের মধ্যে এই সমঝোতা স্মারক চুক্তি স্বাক্ষর হয়।
এই অংশীদারিত্বের মাধ্যমে প্রকল্প বাস্তবায়নে আন্তর্জাতিক প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ, মানসম্মত নির্মাণশৈলী এবং নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করার নিশ্চয়তা মিলবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন বন্দরের ব্যাবসায়ী, আমদানি-রফতানিকারকসহ শিল্প প্রতিষ্ঠানের মালিকরা।চার বছর মেয়াদি মেগা প্রজেক্টের মোট প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৩৫ দশমিক ৭৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪ হাজার ৬৮ কোটি ২৩ লাখ টাকা। বন্দর কর্তৃপক্ষের পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই প্রকল্পের অধীনে বাস্তবায়িত মূল অবকাঠামোগত উপাদানগুলো হলো-দুটি আধুনিক জেটি নির্মাণ। আন্তর্জাতিক মানের কন্টেইনারবাহী জলযান ভেড়ানোর উপযোগী দুটি দীর্ঘ জেটি নির্মান হলে বিদেশ থেকে আসা পন্যবাহী কন্টেইনার খালাস ও সংরক্ষণ করা হবে নির্মাণাধীন এই নতুন জেটিতে।
প্রকল্পের মাধ্যমে নির্মাণ করা হবে প্রশস্ত কন্টেইনার ইয়ার্ড, দ্রুত পণ্য খালাস ও ট্রানজিট নিশ্চিত করতে আধুনিক ইয়ার্ড নির্মাণ করা হলে সেই ইয়ার্ডে রক্ষণাবেক্ষণ করা হবে দীর্ঘ মেয়াদি পণ্য বোঝাই কন্টেইনার। এছাড়াও করা হবে বিপদপ্রবণ পণ্য সংরক্ষণ জোন, কেমিক্যাল বা বিপজ্জনক পণ্য সম্পূর্ণ নিরাপদে ব্যবস্থাপনার জন্য আলাদা ও সুরক্ষিত পৃথক ইয়ার্ড নির্মাণ করা হবে। বন্দরের কার্যক্রমের সুবিধার্থে আধুনিক যন্ত্রপাতি সংযোজন করা হবে। কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের গতি বাড়াতে ক্রেনসহ মোট ৪৯টি ভারী ও অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি স্থাপন ও সংরক্ষণ করা হবে।বদলে যাবে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনৈতিক মানচিত্র দীর্ঘদিন ধরে মোংলা বন্দর ও এর আশেপাশের অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে গ্যাসের অনুপস্থিতি শিল্পায়নের গতি কিছুটা মন্থর করে রেখেছিল। প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে এই সংকট নিরসনে সরকারের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন।মোংলা বন্দরের উন্নয়ন ও আধুনিকায়নে ৪০৬৮ কোটি টাকার মেগা প্রজেক্টে অর্থনৈতিক চিত্র বদলে যাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তিনি স্পষ্ট করে জানান, মোংলা থেকে দেশের উত্তরাঞ্চল পর্যন্ত করিডোরভিত্তিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে টিকিয়ে রাখতে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বর্তমান সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। মোংলা বন্দরের শিল্প কলকারখানায় দ্রুততম সময়ের মধ্যে গ্যাস সংযোগ এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে মাঠপর্যায়ে অবকাঠামোগত কাজের নকশা চূড়ান্ত করেছে। এর ফলে ভারী শিল্প, হিমায়িত খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ প্ল্যান্ট এবং নবনির্মিত বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে ব্যাবসায়ীদের উৎপাদন ব্যয় অনেকাংশে কমে আসবে।
মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল আরিফ আহমেদ মোস্তফার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে জানানো হয়, এই প্রকল্প সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে বন্দরটির অপারেশনাল সক্ষমতা বহুগুণ বেড়ে যাবে। বন্দরের জন্য কন্টেইনার খালাসও বোঝাইয়ের জন্য অত্যাধুনিক ক্রেন ক্রয় করা হলে প্রতি ঘণ্টায় অন্তত ৩০টি কনটেইনার হ্যান্ডলিং করা সম্ভব হবে। যাতে আমরা বছরে কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের লক্ষ্যমাত্রা উন্নীত হবে ৪ লাখ টিইইউজে। এছাড়া ব্যাবসায়ীদের বন্দরের পণ্য পরিবহন, খালাস ও সংরক্ষণ ব্যয় সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসবে। এর ফলে এখানকার আমদানি-রফতানিকৃত পণ্য মোংলা বন্দর থেকে সরাসরি পদ্মা সেতু হয়ে ঢাকা ও উত্তরবঙ্গের সঙ্গে নিরবচ্ছিন্ন সাপ্লাই চেইন প্রতিষ্ঠিত হবে।বিশ্লেষকদের মতে, মোংলা বন্দরের এই আধুনিকায়ন এবং গ্যাস-বিদ্যুৎ সংযোগ নিশ্চিতকরণ কেবল বাগেরহাট বা খুলনা অঞ্চলের জন্য নয়, বরং গোটা জাতীয় অর্থনীতির জন্য একটি গেম-চেঞ্জার হিসেবে কাজ করবে। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে লক্ষাধিক মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে এই অঞ্চলে। বিশেষ করে শিপিং ইন্ডাস্ট্রি, সিএন্ডএফ এজেন্ট, পরিবহন খাত (মাহিন্দ্র, ইজিবাইক ও ভারী ট্রাক অ্যাসোসিয়েশন) এবং স্থানীয় আবাসন ও বাণিজ্যিক খাত চাঙ্গা হয়ে উঠবে।



















