বুধবার, ২৯শে জুলাই ২০২৬, রাত ৮:৩৭

দুধ-চিনিতেও মিলল ক্ষতিকর ‘মাইক্রোপ্লাস্টিক’

টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের মধ্যেই এবার দুধ ও চিনিতেও ক্ষতিকর ‘মাইক্রোপ্লাস্টিক’ শনাক্ত করেছেন গবেষকরা। কাঁচা দুধ, বিভিন্ন ব্র্যান্ডের প্যাকেটজাত তরল ও গুঁড়া দুধ, দুগ্ধজাত পণ্য এবং বাজারে বিক্রি হওয়া চিনিতে এসব ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। গবেষকদের মতে, বিষয়টি খাদ্যনিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্যের জন্য নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
দুধে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি নিয়ে গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) পুষ্টি ও খাদ্যপ্রযুক্তি বিভাগের একদল গবেষক। সানাউল্লাহ মাজুমদারের নেতৃত্বে ১০ সদস্যের গবেষক দল দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সংগ্রহ করা কাঁচা দুধ ও সুপারশপে বিক্রি হওয়া প্রসেসড দুধের নমুনা বিশ্লেষণ করেন। গবেষকদের দাবি, বাংলাদেশে দুধের মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ ও পলিমার ঝুঁকি নিয়ে এটিই প্রথম বিস্তারিত বৈজ্ঞানিক গবেষণা।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, প্রতি ১০০ মিলিলিটার প্রসেসড বা ব্র্যান্ডের দুধে গড়ে ১৫৬ দশমিক ০৬টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে, যা সর্বোচ্চ। কাঁচা দুধে প্রতি ১০০ মিলিলিটারে গড়ে ৯৩ দশমিক ৩৯টি এবং অন্যান্য দুগ্ধজাত পণ্যে গড়ে ৭০ দশমিক ৮০টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা শনাক্ত হয়েছে।
গবেষকদের ধারণা, খামার থেকে দুধ সংগ্রহ, সংরক্ষণ, অ্যালুমিনিয়াম ও প্লাস্টিক পাইপে পরিবহন, কারখানায় প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্লাস্টিকের গ্লাভস ব্যবহার এবং বোতলজাত করার বিভিন্ন ধাপে প্লাস্টিকের সংস্পর্শে আসার কারণেই প্রসেসড দুধে মাইক্রোপ্লাস্টিকের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।
গবেষণাগারে উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে বিশ্লেষণে দেখা যায়, শনাক্ত হওয়া অধিকাংশ প্লাস্টিক কণাই ছিল স্বচ্ছ এবং আঁশ বা তন্তু আকৃতির। দুধে পিটিএফই (টেফলন), পিইটি, নাইলন-৬, পিভিসিসহ বিভিন্ন ধরনের ক্ষতিকর পলিমারের উপস্থিতিও পাওয়া গেছে।
গবেষকদের মতে, সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় শিশুদের শরীরে মাইক্রোপ্লাস্টিক প্রবেশের ঝুঁকি অনেক বেশি। বিশেষ করে ৪ থেকে ১০ বছর বয়সী শিশুদের খাদ্যতালিকায় দুধের পরিমাণ বেশি থাকায় তাদের শরীরে এসব ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা প্রবেশের আশঙ্কাও বেশি।
অন্যদিকে, চিনিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি নিয়ে গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে Journal of Food Composition and Analysis-এ। গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন গবেষক সাদিয়া আফরিন, নায়ন হোসেন এবং মোস্তাফিজুর রহমান।
গবেষণার জন্য ঢাকার বিভিন্ন খুচরা বাজার থেকে সংগ্রহ করা সাত ধরনের বাণিজ্যিক চিনি—ব্র্যান্ডেড ও খোলা—পরীক্ষা করা হয়। এতে দেখা যায়, ব্র্যান্ডেড চিনিতে প্রতি কেজিতে গড়ে ৩২২টি এবং খোলা বা নন-ব্র্যান্ডেড চিনিতে গড়ে ৪০৩টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা রয়েছে। যদিও দুই ধরনের চিনির মধ্যে পার্থক্য পরিসংখ্যানগতভাবে উল্লেখযোগ্য নয়, তবু খোলা চিনিতে দূষণের মাত্রা তুলনামূলক বেশি পাওয়া গেছে।
পরীক্ষায় শনাক্ত হওয়া মাইক্রোপ্লাস্টিক কণাগুলোর আকার ছিল প্রায় ১২ মাইক্রোমিটার থেকে ৩ দশমিক ১৯ মিলিমিটার পর্যন্ত। এর মধ্যে প্রায় ৬৩ শতাংশ ছিল তন্তু (ফাইবার), ২১ শতাংশ খণ্ড (ফ্র্যাগমেন্ট), ১১ শতাংশ পাতলা স্তর (ফিল্ম) এবং ৫ শতাংশ গোলাকার কণা।
গবেষকদের মতে, এসব মাইক্রোপ্লাস্টিক মূলত প্লাস্টিকের প্যাকেজিং, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ যন্ত্রপাতি, পরিবহন, সংরক্ষণ এবং পরিবেশে ছড়িয়ে থাকা ক্ষয়প্রাপ্ত প্লাস্টিক থেকে খাদ্যে প্রবেশ করতে পারে।
রাসায়নিক বিশ্লেষণে অ্যাক্রাইলোনাইট্রাইল বিউটাডিয়েন স্টাইরিন (এবিএস), পলিভিনাইল ক্লোরাইড (পিভিসি), পলিইথিলিন টেরেফথ্যালেট (পিইটি), পলিটেট্রাফ্লুরোইথিলিন (পিটিএফই), উচ্চ ঘনত্বের পলিইথিলিন (এইচডিপিই) এবং নাইলনসহ একাধিক প্লাস্টিক পলিমারের উপস্থিতিও নিশ্চিত হয়েছে।
টুথপেস্টের পর দুধ ও চিনিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি খাদ্যপণ্যে প্লাস্টিক দূষণের বিষয়টি আরও স্পষ্ট করেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট গবেষকরা। তাদের মতে, খাদ্য উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণের প্রতিটি ধাপে দূষণের উৎস শনাক্ত করে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি।
পুরাতন সংবাদ পড়ুন
« মার্চ ২০২৭ »
সোমমঙ্গলবুধবৃহশুক্রশনিরবি
১০১১১২১৩১৪
১৫১৬১৭১৮১৯২০২১
২২২৩২৪২৫২৬২৭২৮
২৯৩০৩১    

অনুসরণ করুন